বিভিন্ন সময়ে রাজনীতিতে এমন কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে দেখা যায় যা আসলেই নিন্দনীয়। যেখানে রাগ সামাল দিতে না পেরে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেই নানা বিবেধের সৃষ্টি হয়। আর এবার এমনই ঘটনা ঘটেছে লালমনিরহাটের নেতাকর্মীদের মধ্যেও। জানা যায়, সম্প্রতি লালমনিরহাটের আদিতমারীর এক ইউএনও’কে অকথ্য ভাষায় গা/লি/গা/লা/জ সহ /মা/র/ধ/রে/র হু/ম/কি/র অভিযোগ ওঠেছে উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে। যদিও পরবর্তীতে এ বিষয়টি কায়েস অস্বীকার করলেও ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে অসদাচরণের লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিনসহ ১৮ সরকারি কর্মকর্তা।

ইউএনওসহ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রের একটি কপি শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) রাতে পূর্বপশ্চিমের হাতে এসেছে। তবে উপজেলা চেয়ারম্যান অভিযোগের বিষয়ে অস্বীকার করেছেন।

এদিকে জেলা প্রশাসক অভিযোগ পাওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) রফিকুল ইসলামকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেছেন বলে জানান।

লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় সভা চলার সময় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কাছে ভিজিডি ও মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ডের অংশ দাবি করেন। এ সময় ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন বিধি মোতাবেক তালিকা প্রণয়নের কথা বললে ক্ষিপ্ত হয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন উপজেলা চেয়ারম্যান।

এর কিছুক্ষণ পরে ইউএনও অফিস সংলগ্ন করিডোরে লাগানো সিসি টিভি ক্যামেরাটি উপজেলা চেয়ারম্যান তার একজন ব্যক্তিগত লোক দিয়ে খুলে ফেলতে থাকেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দৃষ্টিতে এলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সিসি টিভি ক্যামেরা খোলার দৃশ্যটি মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে গেলে চে/য়া/র/ম্যান অকথ্য ভাষায় /গা/ল/ম/ন্দ ক/রেন। এ সময় চেয়ারম্যান ইউএনওকে বলতে থাকেন, ’বেশি কথা বললে /পি//টি/য়ে/ নরসিংদী (ইউএনও’র বাড়ি) পাঠিয়ে দেবো। উপজেলা পরিষদ কি তোর বাবার সম্পত্তি? উপজেলা পরিষদ কি তুই চালাবি?’

এ অবস্থায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উপজেলা চেয়ারম্যানকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তাকেও ’/ঘা//ড় /ধরে উপজেলা পরিষদ থেকে বে/র করে দেবো’ বলে /হু/ম/কি/ দেওয়া হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এ সময় অন্যান্য অফিসার এর প্রতিবাদ জানালে তাদেরও /গা/লি/গা/লা/জ/ করেন চেয়ারম্যান। খবর পেয়ে আদিতমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

লিখিত অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা নুরেলা আকতারকে চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস তার অফিস কক্ষে ডে/কে নিয়ে অ/ক/থ্য/ ভাষায়/ /গা/লি/গা/লা/জ করেন। তিনি কর্মচারী ডেকে বলতে থাকেন, ’বে/য়াদ/বটাকে গ/লা/ /ধা//ক্কা/ দি/য়ে বের করে দাও। রাস্তায় কেউ মা/ন/হা/নি ঘটা/লে এর দা/য় কেউ নেবে না।’

জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো লিখিত আবেদনের অনুলিপি সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি ও রংপুর বিভাগীয় কমিশনারকে অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ মোট ১৮ জন কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে।

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন বলেন, ’উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের সবকিছুই ঠিক আছে। তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। কিন্তু উনার ব্যবহার বা আচরণটা ভালো নয়। এভাবে কেউ কাজ করতে পারে না। আমরা সবকিছুই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু হচ্ছিল না। গত বৃহস্পতিবারের (১২ নভেম্বর) ঘটনায় বাধ্য হয়েই জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে লিখিতভাবে প্রতিকার চেয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, ’লিখিত প্রতিকার চাওয়ার আগে আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের ওখানে অপেক্ষা করেছি হয়তো তিনি এসে বিষয়টি সুরহা করবেন। কিন্তু তিনি কথা দিয়েও আর আসেননি। পরে আমরা লিখিত দিয়েছি। অভিযোগে উল্লিখিত সবকিছুরই প্রমাণ রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ’উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের আশপাশের কিছু লোকজন তার কান ভারি করে থাকে। এসব লোকজনের মধ্যে কয়েকজনের কথায় তিনি আমাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন বলে মনে হয়। তিনি মনে করেন, আমরা এখানে সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত। উনার দৃষ্টিতে সবসময় সন্দেহ।’

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ১৮ কর্মকর্তার অভিযোগের বিষয়ে পড়ে শোনালে উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস বলেন, ’আমি কাউকে খারাপ কিছু বলিনি। ইউএনও সব কর্মকর্তাকে একত্র করে আমার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগপত্রে যে ভাষায় লেখা হয়েছে, এসবের কোনও ভিত্তি নেই। আমি সঠিক তদন্ত চেয়েছি।’

তিনি বলেন, ’স্থানীয় জনগণের অভিযো/গ, উপজেলার অফিসগুলোতে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছে। জ/ন/গ/ণ/কে হ/য়/রা/নি করা হয়। উপজেলার প্রত্যেক দফতরের প্রধানদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও /হ/য়/রা/নি বন্ধ করতে বলেছি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মোতাবেক সুশাসন নিশ্চিত করতে বলেছি। আমার এ কথাগুলো বিএনপি-জামায়াত সমর্থন করে কতিপয় কর্মকর্তা স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। বরং উল্টো আমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করে আসছে। এ অভিযোগ তারই ফসল।’

ইমরুল কায়েস বলেন, ’আমি কখনও কারও সঙ্গে কোনও অন্যায় করিনি। জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলি। আমার পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে, তাই কোনও কোনও কর্মকর্তা এতে রুষ্ট হয়ে এই অভিযোগে ইউএনও’র সঙ্গে শামিল হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ’আমার পিতা জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক সামসুল ইসলাম সুরুজকে ২০০৩ সালে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, এখনও বিচার হয়নি। এখন আমার বিরুদ্ধেও নানা ষড়যন্ত্র চলছে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ’প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে যে কথা হয়েছে, তা তিনি না বলে উল্টোভাবে উপস্থাপন করেছেন। এটা একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি করতে পারেন না। এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যা করছেন, সেটাও আপনারা (গণমাধ্যম) তদন্ত করে দেখেন, আসলে ভেতরের ঘটনা অন্য কিছু আছে কিনা।’



এবিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে জানান, এ ব্যাপারে তিনি ইতিমধ্যে অবগত হয়ে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেছেন। তদন্তের এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।