বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি সম্প্রতি বাংলাদেশেও হানা দেয় করোনার নতুন ঢেউ। ফলে আবারও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, অন্যদিকে থেমে নেই প্রাণহানির সংখ্যাও। আর সেহেতু করোনা সংক্রমন রোধে দেশের সকল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ফলে জীবিকার তাগিদে পেশা বদলাতে হয়েছে অনেককে। ঠিক যেমনটা ঘটেছে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় একটি ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিক মুনছুর মিয়ার সাথেও।

তিনি বলেন, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রাম এলাকায় নতুন বাজার নামে একটি স্থানে একটি ভ্যারাইটিজ স্টোর রয়েছে আমার। এই দোকান করার পেছনেও রয়েছে কষ্টের এক বিশাল ইতিহাস। আমি ছাত্র জীবন থেকে চাকরি করি আর যে টাকা বেতন পেয়েছি সেখান থেকে কিছু কিছু টাকা জমিয়ে শেষ সম্বল দিয়ে একটি ভ্যারাইটিজ স্টোর দিয়ে ব্যবসা শুরু করি।

এই লকডাউন আমার সেই কষ্টে উপার্জিত আয়ের টাকার ব্যবসায় ধস নামিয়ে রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছে আমাকে। দিনের আলোয় পারি না শ্রমিকের কাজ করতে কারণ পরিবার আর আত্মীয়-স্বজনের সম্মানের কথা বিবেচনা করে। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লোক লজ্জায় সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মোটরসাইকেলে ভাড়ায় যাত্রী আনা নেওয়ার কাজ করি।। তাও আবার মাঝে মাঝেই চোর পুলিশের খেলায় মেতে উঠতে হচ্ছে।


শনিবার (২৬ জুন) সন্ধ্যার পর মানিকগঞ্জ জেলার প্রবেশ দ্বার বারবারিয়া ব্রিজের কাছাকাছি এলাকায় কথা হয় বেশ কয়েকজন ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলচালকের সঙ্গে।

মুনছুর মিয়া আরো বলেন, দোকানের অনেক পণ্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। এখন সেই পণ্যের এসআর যারা আছেন তারাও তা ফেরত নিতে চাচ্ছেন না। একে তো লকডাউন আর অন্যদিকে দোকানের ভেতর মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় অনেক পণ্যই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দোকান বন্ধ রাখায় কোনো আয় করতে পারছি না। সব মিলিয়ে অনেকটাই কষ্টের মধ্যে কাটাচ্ছি জীবন। হাতে নেই কোনো টাকা, এরই মধ্যে পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় আমার দ্বিতীয় সন্তান। যেকোনো সময় স্ত্রীকে নিয়ে যেতে হবে হাসপাতালে। অথচ ওষুধ কেনার কথা বাদ দিলাম, স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যাবো সেই গাড়ি ভাড়ার টাকাও নেই আমার কাছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার প্রবেশদ্বার বারাবারিয়া ব্রিজের গোড়ায় সন্ধ্যার পর থেকে ডাবল মাস্ক ও হেলমেট পড়ে অনেকেই মোটরসাইকেল নিয়ে হাজির হয়েছেন। পরিচিতদের দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে অন্য মনস্ক হওয়ার একটা নাটক করছেন। অধিকাংশ বাইকাররা কোনো না কোনো ছোট খাটো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিন্তু লকডাউনের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পরিবারের খরচ চালাতে যাত্রী পরিবহন করার এই কাজটাকে বেছে নিয়েছেন। প্রত্যেকটি মোটরবাইকরের চোখে মুখে হতাশার ছাপ পড়ে আছে কারণ হিসেবে অনেকেই বলছেন আয় না থাকায় সংসার চালানোটাই দুস্কর হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ বাইকারা যে জেলার প্রবেশদ্বার থেকে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যাত্রী বহন করছে তা তাদের পরিবারের অনেকেই জানেন না এমনটাই বলছেন তারা।

জেলার গড়পাড়া এলাকার আরো এক বাইকার আরিফ বলেন, আমি একটি গাড়ির সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি করতাম কিন্তু এই লকডাউনের কারণে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়ে গেছি। আমি আমার পরিবারের একমাত্র উপার‌্যনকারী ব্যক্তি, বাবা মা নিয়ে আমার সংসার। মা গুরুতর অসুস্থ তার জন্য প্রতিদিন ১১শ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। যেহেতেু লকডাউন, পরিবহন চলাচল বন্ধ তাই বলে কি মায়ের ওষুধ খাওয়া বন্ধ থাকবে। সে কারণে দিন রাত এক করে যাত্রী পরিবহন করছি মোটরসাইকেল দিয়ে। প্রতিদিন যে টাকা আয় হচ্ছে সে টাকা দিয়ে মায়ের ওষুধ আর সংসারের অন্যান্য খরচ কোনোমতে চলে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরো এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, লকডাউনের কারণে অধিকাংশ মানুষ বিপদে পড়েছে। কিন্তু কেউ বলতে পারে আবার অনেকে না খেয়ে মরে গেলেও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের করবে না পারিবারিক মর‌্যাদার ভয়ে। নিম্ন আয়ের মানুষ সবার কাছে হাত পেতে চাইতে পারবে কিন্তু আমার মতো মানুষ হাত পেতে চাইতে পারবে না। এ সব বিষয় চিন্তা করে রাতের আঁধারে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন কাজ বেছে নিয়েছি।


এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্যর সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি টিম ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চেকপোস্ট বসিয়েছে। ফলে কেউ মোটরসাইকেল যাত্রী পরিবহন করতে পারছে না। এ সময়ে তিনি আরও জানান, সতর্কতামূলক নির্দেশান অমান্য করার অনেককে মামলার আয়তায় আনা হয়েছে।