মডেলিংয়ের অন্তরালে ধনী পরিবারের সন্তানের টার্গেট করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার পাশাপাশি নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সম্প্র‍তি পুলিশের জালে বন্দি হন কথিত মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ও মরিয়ম আক্তার মৌ। আদালতের নির্দেশে এই মুহুর্তে কারাগারেই অবস্থান করছেন তারা। তবে এরই মধ্যে এবার ঘটলো নতুন আরেক ঘটনা। জানা যায়, পিয়াসা ও মৌয়ের সঙ্গে ’অন্তরঙ্গ ছবি’ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে কিছু ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদাবাজি করা হয়েছে। এই ’নীরব চাঁদাবাজি’র শিকার কিছু ব্যক্তি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন, তবে বেশির ভাগই গোপনে সমঝোতা করছেন। এই সুযোগে প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছে কথিত মিডিয়ার ’সাংবাদিকচক্র’।
একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে এমনই একটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম টিম। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- পল্টন থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী আল জাহিদ ও তার সহযোগী সাইদ আব্দুস সানি ওরফে ডিজে সানি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাহিদ বিভিন্ন সূত্রে অ্যাপের মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করেন। এরপর সহযোগীদের নিয়ে তা এডিট করে কথিত নিউজ পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেলে ছেড়ে দেন। এরই মধ্যে যাদের সঙ্গে মৌ, পিয়াসাসহ এমন মডেলদের ছবি পাওয়া যায়, তাদের অ্যাপে কল করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। তাদের প্রতারক সিন্ডিকেটে কিছু কথিত সাংবাদিকও আছেন।

গত ১৩ আগস্ট শাহরিয়ার মাকসুম নামে গুলশানের ১ ব্যক্তির কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহিদ। শাহরিয়ারের স্ত্রী তাজরুনা হোসেন নেভী ১৭ আগস্ট তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় জাহিদ ও সানির নাম উল্লেখ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। ওই দিনই গ্রেপ্তারের পর ১৮ আগস্ট ডিবি পুলিশ দু’জনকে আদালতের নির্দেশে ০১ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

এদিকে পল্টনের একাধিক সূত্র জানায়, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানোর কারণে আগেই কাজী আল জাহিদকে ছাত্রলীগের কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জামান টাওয়ারের ক্যাসিনো কাণ্ডে খালিদ মাহমুদ ভুঁইয়ার অন্যতম সহযোগী ছিলেন জাহিদ। সেখানকার ক্যাশিয়ার শরিফুল হক তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। পল্টন থানা ছাত্রলীগের কমিটির বিরুদ্ধে কয়েক দফায় চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠায় গত ৩ বছরে দুইবার কমিটি ভেঙে দিয়েছে হাইকমান্ড।

গত ১৭ আগস্ট গুলশানের বাসিন্দা শাহরিয়ার মাকসুমের স্ত্রী তাজরুনা হোসেন নেভী তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় অভিযোগ করেন, পিয়াসা ও মৌর সঙ্গে ছবি ছড়ানোর ভয় দেখিয়ে তার স্বামীর কাছ থেকে হোয়াটস অ্যাপে ৩ লাখ টাকা দাবি করা হয়।

মামলার এজাহার ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ১৩ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে নেভী ও তার স্বামী তেজগাঁওয়ের লাভ রোডে অবস্থান করছিলেন। এ সময় হোয়াটস অ্যাপে শাহরিয়ার মাকসুমকে ফোন দিয়ে জানানো হয়, মডেল পিয়াসা ও মৌর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবিসহ কিছু ডকুমেন্ট আছে জাহিদের কাছে। ৩ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে সেগুলো সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন নিউজ মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

গুলশানের ১২৬ নম্বর সড়কের বাসিন্দা নেভী তার অভিযোগে আরো বলেন, জাহিদ তার স্বামীকে বলেন, ঘটনাটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কিছু সাংবাদিক অবগত আছেন। চাহিদামতো টাকা না দিলে মিডিয়ায় প্রচার করে ভাইরাল করে দেওয়া হবে। এজাহারে ’বাংলাদেশ সংবাদ প্রতিদিন’ ও ’দৈনিক আইবার্তা’ নামে দুটি কথিত নিউজ পোর্টাল এবং একটি ইউটিউবের লিংক দেওয়া হয়। এসব কথিত নিউজ ও ভিডিওতে শাহরিয়ার মাকসুমের সঙ্গে পিয়াসা ও মৌর ছবি এডিট করে প্রকাশ করা হয়। এগুলো প্রচার করে কথিত সাংবাদিকের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব দেন তারা।

১৭ আগস্ট জাহিদ ও সানিকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ১৮ আগস্ট ঢাকা মহানগর হাকিম মাসুদ-উর-রহমানের আদালতে হাজির করে তাদের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রেজাউল করিম। আদালত শুনানি শেষে ১ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

ডিবির সূত্র জানায়, জাহিদ ও সানির সিন্ডিকেটে আরো ৪-৫জন সহযোগী আছে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, মানহানিকর তথ্য-উপাত্ত প্রচার ও প্রকাশ করে। অ্যাপে গোপন যোগাযোগে তারা পিয়াসা, মৌসহ কয়েকজন মডেলের সঙ্গে ছবি নিয়ে এডিট করে ভিডিও বানায়। এই চক্রে ভুঁইফোড় অনলাইন পত্রিকার কথিত সাংবাদিকও আছে। পিয়াসা, মৌ ও চিত্রনায়িকা পরীমনি গ্রেপ্তারের পর তারা এমন ছবি এবং চটকদার সংবাদ সংগ্রহ করে বিভিন্নজনকে পাঠায়। গুলশান ও বনানীর প্রতিষ্ঠিত কিছু ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিকেও তারা ফাঁদে ফেলে। তবে শাহরিয়ার মাকসুমের পরিবার ছাড়া অন্যরা অভিযোগ করেননি। জিজ্ঞাসাবাদে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও প্রচারে জড়িত কয়েকজনের নাম পেয়েছেন তদন্তকারীরা। রিমান্ড শেষে জাহিদ ও সানি এখন জেলহাজতে রয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম টিমের উপ-কমিশনার (ডিসি) শরিফুল ইসলাম আরটিভি নিউজকে বলেন, ’কথিত মডেল পিয়াসা ও মৌয়ের ছবি-ভিডিওর ফাঁদ পেতে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করায় ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এখনই আর কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত রিপোর্টের পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।’

উল্লেখ্য, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত ১ আগস্ট রাতে অভিযান চালিয়ে মডেল পিয়াসা ও মৌকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময়ে তাদের বাসা থেকে ম/দ ও মা/দ/ক/দ্র/ব্য উদ্ধার করা হয়। একই সাথে এ ধরণের অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনের তথ্য পান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।